
টাইমস নিউজ ডেস্ক
যখনই মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-স্বজনদের জন্য কোটা বরাদ্দ হয়, তখনই যারা মাঠে নামেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে ইচ্ছা হয়। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে জাগে, তারা কাদের উত্তরসূরি? কথা হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধাদের স্বজনদের জন্য কোটা বহু কারণে প্রয়োজন; কয়েকটি বলছি।
প্রথমত, ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবনের মায়া ত্যাগ করে যারা সম্মুখসারিতে লড়েছেন, বেশির ভাগই ছিলেন আমজনতা। যুদ্ধের ময়দানে খেয়ে না-খেয়ে বিশ্বের অন্যতম রণসজ্জার মুখোমুখি অদম্য সাহস নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধে তাদের বাড়ি লুট হয়েছে। রাজাকার-আলবদর তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, ভিটেমাটি তছনছ করে ঘরের ইট-বেড়া-চাল খুলে নিয়ে গেছে। স্বাধীন দেশে তারা যখন আবার নতুন করে বাঁচতে প্রবল সংগ্রাম করেছেন, তখনও সেই প্রকৃত যোদ্ধারা রাষ্ট্রের, সমাজের তরফে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। বরং সমাজের সম্পদশালী, সুবিধাবাদী ক্ষমতাবানরাই লুটে নিয়েছে সবকিছু।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের বছর যে ছেলেটি ছিল সবচেয়ে মেধাবী, ক্লাসে প্রথম; সেই ছেলে যুদ্ধে গিয়ে হাত কিংবা পা হারিয়ে পঙ্গু হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অসহায় জীবন যাপন করেছে। আর যারা যুদ্ধ থেকে জীবন নিয়ে ফেরেননি, তাদের স্বজন-প্রিয়জন, স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের কী অবস্থা গেছে– সেই খবর আমরা কি রেখেছিলাম? তাদের সন্তানরা মেধাবী হলেও পিতা বা পরিবারের অসহায়ত্বের কারণে উচ্চশিক্ষা, উন্নত জীবনমান থেকে বঞ্চিত থেকেছে।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এই বীরদের জন্য কিছু করার চেষ্টা শুরু করেছিলেন বটে। তবে ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সেই চেষ্টাও বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ভাগ্য আমাদের, নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্বাধীনতার মর্ম উপলব্ধি করার ক্ষমতাই আজকের প্রজন্মের নেই। তারা নিজ দেশের স্বাধীনতা অর্জনে দীর্ঘ রক্তাক্ত পথপরিক্রমার ইতিহাস এবং বীরদের সম্পর্কে অজ্ঞ, এটা ভাবা যায়?
তৃতীয়ত, প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাদের স্বজন, সন্তানেরা এই সমাজেই আছেন। তবে তাদের মাত্র এক ভাগ দেখা যায়, বাকি তিন ভাগ আইসবার্গের মতো পানির নিচে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছে। দেশ স্বাধীন করার বিনিময়ে কী সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্র দিতে পারে, প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সে হিসাব ছিল না। সংগত কারণেই প্রকৃত বীররা সনদ নেওয়ার সেই দীর্ঘ সারিতে ঝাঁপিয়ে পড়াদের দলে ছিলেন না। তারা অনেক পরে সনদের লাইনে দাঁড়িয়েছেন, তাও আশপাশের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের আস্ফালনে বাধ্য হয়ে।
চতুর্থত, আমার বাবার সঙ্গে তাঁর বিত্তবান যে বন্ধুরা যুদ্ধ করার মনোবৃত্তি নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে গিয়েছিলেন, তারা প্রায় সমবয়সী ও একই এলাকার। সংখ্যায় ২০ থেকে ২৫ জন। শেষ পর্যন্ত সেই বন্ধু গ্রুপের মাত্র ৭-৯ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে যুদ্ধ করেছেন। বাকিরা প্রশিক্ষণ শেষ করতে পারেননি। যুদ্ধের ময়দানের অনিশ্চয়তা, কঠোর-কঠিন পরিশ্রম, দিনের পর দিন খাবার সংকট তারা মানাতে পারেননি। যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্র তারা দেশে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আগের সুযোগ-আরাম-আয়েশের জীবনে ফিরেছেন। লেখাপড়া শুরু করেছেন, চাকরি, উচ্চশিক্ষা সবই শুরু করে নিজেকে-নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছেন নতুন রুটিনে।
সত্যিকারের অকুতোভয় বীররা যুদ্ধদিনের ভয়াবহতাকে জয় করে কী করেছেন? যুদ্ধে যাওয়ার কারণে নিজ গ্রামে রাজাকার-আলবদরদের চক্ষুশূল হয়ে, বাবা-মা, ভাইবোনের জীবন হুমকিতে ফেলে একবার সর্বস্বান্ত হয়েছেন; আরেকবার বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিতে নিজেকে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে কেরানির চাকরির জীবনে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থায় জীবনভর অভাবের সঙ্গে লড়েছেন। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে এই মুক্তিযোদ্ধারা আবারও আরেক ধাক্কায় স্বাধীনতার আবেগ আর দেশপ্রেমের মূল্যবোধে নিজেকে চালাতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছেন।
এভাবে সময়ের পরিক্রমায় প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের জীবনের ট্রেন সময়মতো সুখের স্টেশনে পৌঁছেনি; মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-স্বজনরা অভাবে, দারিদ্র্যে, রাজনৈতিক ধিক্কারে কঠিন অসহনীয় জীবন পার করেছেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী দিনগুলোতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অফিস-আদালতে কী বৈষম্য, হয়রানির শিকার হয়েছেন, ইতিহাস তার সাক্ষী। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা মূল্যবোধ ও স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন, তাদের তো পাড়া-মহল্লায় টিটকারি ও হয়রানি ছিল নিত্যদিনের। রাজধানী শহরে রাজনৈতিক দলের রথী-মহারথীদের স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে মাখামাখি থাকলেও মফস্বল শহরে আবেগের লড়াই ছিল নির্মম। তখন কঠিন দুঃসহ দিন যেভাবে কেটেছে, এক ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ তা মনে রাখেনি।
জানি, আজ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা সনদ এবং সুবিধা– দু’ভাবেই সফল। একাত্তরের পরাজিত শক্তির সঙ্গে মিত্রতায় তাদের কোনো সমস্যা হয়নি। অন্যদিকে প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধারা দফায় দফায় বাধাগ্রস্ত হয়ে জীবনের খেরোখাতার হিসাব মেলাতে ব্যর্থই হয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তান-স্বজনদের পক্ষে বিদ্যমান সমাজে সমতার সাম্য পাওয়া এখন সত্যিই কঠিন।
তবে পরাজিত শক্তির পাশাপাশি হঠাৎ গজিয়ে ওঠা লোক দেখানো সুবিধাভোগী, নব্য দেশপ্রেমিক বিষধর শক্তির বিরুদ্ধে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাই স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের আবেগ, অনূভূতি নিয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখেন। তাদের প্রতি সামান্য কুর্নিশ জানাতে তাদের সন্তান-স্বজনদের বেহাল অবস্থার উন্নয়নে মুক্তিযোদ্ধার কোটা বহাল রাখা তাই সময়ের দাবি। যারা এতটা ত্যাগ করেছেন, সেই ত্যাগের মূল্যায়ন রাষ্ট্র-সমাজ করবে না? দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগকারীদের শ্রম, ঘাম, আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তের মূল্য রাষ্ট্র দেবে না?