
মোঃ রফিকুল ইসলাম:-
গৌরনদী উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রামের নাম বাটাজোর। নদীর কাছাকাছি মাটির ঘরে থাকত পারুল আখতার। তার স্বামী রহিম মিয়া দিনমজুর। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে-ঘাটে কাজ করে যা আয় হয়, তাতে ছয় সদস্যের সংসার চালানো কষ্টসাধ্য। অভাবের চাপে প্রায়ই ডাল-ভাতের সঙ্গে লবণ মেখে খেতে হয়। রহিম মিয়ার স্ত্রী পারুল “ফ্যামিলি কার্ডের জন্য দরখাস্ত করেছে। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বলেছে যাচাই-বাছাই এর পর , লিস্টে তোমার নাম আছে বলে আশা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু অনেক দিন কেটে যায়, কার্ড আসে না। মাঝে মাঝে সরকারি ত্রাণ আসে, কিন্তু তা অপর্যাপ্ত। একদিন ইউনিয়নের অফিস থেকে পারুল আখতার খবর পেল তার ফ্যামিলি কার্ড অনুমোদন হয়েছে। এই কার্ডে সরকারি সুবিধা—চাল, তেল, ডাল, চিনি কম দামে পাওয়া যাবে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুদের পুষ্টি সহায়তা পাওয়া যাবে। প্রথম মাসেই কার্ড দেখিয়ে তারা ৩০ কেজি চাল, দুই লিটার তেল, এক কেজি ডাল পেল। যা আগে পুরো মাসের বাজার খরচ ছিল, এখন তার অর্ধেক। পারুল ছেলেকে সাহস দিয়ে বলে তুই লেখাপড়া শিখে অনেক বড়ো হবি। টাকা পয়সার অভাবে কেউ পড়তে পারবে না, কেউ চিকিৎসা পাবে না, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বাস করে না।
ফ্যামিলি কার্ড হলো একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ-ভিত্তিক স্মার্ট কার্ড। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তাও পাবে। এর মূল লক্ষ্য সমাজের প্রান্তিক, হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন।
বিএনপি সরকারের সফলতার প্রতীক বাংলাদেশের ইতিহাসে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। ২০২৬ সালের ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ঢাকার কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এটি শুধু একটি কার্ড নয়, বরং বিএনপি সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্ব, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্যমোচন এবং স্বচ্ছ ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের প্রতীক। নির্বাচনি ইশতেহারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার থেকে বাস্তবে রূপান্তরিত এই উদ্যোগ দেশের লাখ লাখ পরিবারের জীবন বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল| ২০২৫ সাল নাগাদ প্রায় ২৫ টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১০০ টিরও বেশি কর্মসূচি চলছিল, যার সম্মিলিত বাজেট জিডিপির প্রায় ১.৯ শতাংশ। কিন্তু এই ব্যবস্থায় ছিল তথ্যের পুনরাবৃত্তি, দুর্নীতি, লিকেজ এবং প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার সমস্যা। অনেক সচ্ছল ব্যক্তি একাধিক সুবিধা ভোগ করতেন, আবার প্রকৃত অভাবিরা খালি হাতে ফিরতেন। কোভিড-১৯ মহামারি, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে চরম অর্থনৈতিক চাপে ফেলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষণা করে—দেশের ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দ্রুত এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নামে।
ফ্যামিলি কার্ডের মূল দর্শন: “ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক”। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং পরিবারকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত উন্নয়ন। ফ্যামিলি কার্ড হলো একটি ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড, যাতে পরিবারের সদস্যদের মৌলিক তথ্য (নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম তারিখ, ঠিকানা ইত্যাদি) একসাথে নথিভুক্ত থাকে। কার্ডটি পরিবারের প্রধান নারীর (মা বা নারী প্রধান) নামে ইস্যু করা হয়। এতে কন্টাক্টলেস চিপ, কিউআর কোড এবং এনএফসি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা জালিয়াতি রোধ করে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চালুকৃত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় যোগ্য দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে (বিশেষ করে নারীপ্রধান পরিবার) প্রতি মাসে ২,৫০০ (দুই হাজার পাঁচশত) টাকা করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এই টাকা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরকারি কোষাগার থেকে জি-টু-পি (Government to Person) পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সুবিধাভোগীর নির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অথবা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে — যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদিতে — সরাসরি জমা হয়ে যায়। কার্ড ইস্যু এবং তথ্য সংগ্রহের সময় পরিবারের সদস্য (সাধারণত গৃহকর্ত্রী) এর সচল মোবাইল নম্বর ও ব্যাংক/এমএফএস অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যা আইবাস++ সিস্টেমের মাধ্যমে যাচাইকৃত হয়। যোগ্যতা নির্ধারণের পর কার্ডধারীদের তালিকা চূড়ান্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাসিক ভাতা ট্রান্সফার শুরু হয়, যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং দুর্নীতির সম্ভাবনা কমে। পাইলট প্রকল্প থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে এই প্রক্রিয়া চলমান, যেখানে ডোর-টু-ডোর তথ্য সংগ্রহ ও কম্পিউটারাইজড যাচাইয়ের মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচিত হন। ফলে টাকা দ্রুত, নিরাপদ ও সরাসরি একাউন্টে পৌঁছে যায়।
প্রক্সিমেট মিনস টেস্ট (PMT) স্কোরিং এবং ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (DSR) ব্যবহার করে প্রকৃত অভাবি পরিবার চিহ্নিত করা হয়। এটি দুর্নীতি কমায় এবং টার্গেটিংয়ের নির্ভুলতা বাড়ায়। ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারীকেন্দ্রিকতা। কার্ড নারীর নামে ইস্যু হওয়ায় তিনি সরাসরি অর্থ নিয়ন্ত্রণ করেন। এটি নারীর অর্থনৈতিক স্ববলম্বন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর হাতে অর্থ পৌঁছালে তা শিশুদের পুষ্টি, শিক্ষা এবং পরিবারের স্বাস্থ্যে বেশি ব্যয় হয়। বিএনপি সরকারের এই উদ্যোগ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে শুরু হওয়া ফুড ফর এডুকেশনের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত।
সরকার ইতিমধ্যে ডায়নামিক রেজিস্ট্রি এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনা (GRS) চালু করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এটিকে ইউনিভার্সাল সোশ্যাল আইডিতে রূপান্তরের লক্ষ্য। তুলনামূলক দৃষ্টিকোণ বিশ্বে ব্রাজিলের ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’, মেক্সিকোর ‘প্রোগ্রেসা’র মতো কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার প্রোগ্রাম সফল হয়েছে। বাংলাদেশের ফ্যামিলি কার্ড এর সাথে মিলে যায় কিন্তু নারীকেন্দ্রিকতা ও ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশনে অনন্য। খালেদা জিয়ার আমলের উদ্ভাবনী কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে এটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিটি নাগরিকের জন্য সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি হিসেবে এটি রূপান্তরিত হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি মডেল হয়ে উঠবে। সফলতার প্রতীক হিসেবে বিএনপি সরকারের ফ্যামিলি কার্ড প্রমাণ করেছে যে, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়—এটি মানুষের জীবন স্পর্শ করার মাধ্যম। সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্বে এই কর্মসূচি দারিদ্র্য, অসমতা ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
এটি শুধু একটি কার্ড নয়—এটি আশা, ক্ষমতায়ন এবং সমৃদ্ধির প্রতীক। সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতি হিসেবে গড়ে তুলবে।
এই প্রকল্পের মূল বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ তৈরি করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর| প্রকল্পের আর্থিক ও নীতিগত দিক তদারকির জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কার্ড সবার জন্য নয়। হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা মূলত এই কার্ডের সুবিধা পাবেন। তবে আপাতত হতদরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে এই কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হবে। কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনা রাখা হবে না। সরকারি নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্যের পরিবার, হিজড়া, বেদে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবার ও শূন্য দশমিক ৫ একর বা তার কম জমির মালিকরা এই কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতি পরিবারের সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্যকে এই কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে একান্নবর্তী পরিবার হলে প্রতি পাঁচজনের জন্য আলাদা কার্ড দেওয়া হবে। পরিবারের প্রধান নারী বা মা এই কার্ড পাবেন এবং একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা পাবেন না। তবে সরকারি চাকরিজীবী বা নিয়মিত পেনশনভোগীরা এর আওতাভুক্ত হবেন না। এছাড়া, বাড়িতে এসি ব্যবহারকারী, নিজস্ব গাড়ি বা বিলাসবহুল সম্পদের মালিক ও যাদের বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড়ো ব্যবসা রয়েছে, তারাও এই সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের নতুন পাইলট প্রজেক্ট অনুযায়ী, কার্ডধারীরা দুই ধরনের সুবিধা পাবেন—নগদ অর্থ সহায়তা ও সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য। প্রতিটি কার্ডধারী পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই এই টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (যেমন বিকাশ বা অন্যান্য বৈধ চ্যানেল) মাধ্যমে পৌঁছে যাবে। আরেকটি হলো এই কার্ডের মাধ্যমে বাজারদরের চেয়ে অনেক কম দামে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল ও চিনি কেনা যাবে। আবেদন প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু না হলেও কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি ও নিবন্ধিত সচল একটি মোবাইল নন্বর বা ব্যাংক নন্বর রাখতে হবে। পরের ধাপে স্থানীয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ও সরকারের অনলাইন পোর্টাল থেকে আবেদন ফরম পাওয়া যাবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ও অনিয়ম রোধে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করা হচ্ছে। সুবিধাভোগী নিয়মিত টাকা পাচ্ছেন কি না, সরকার তা তদারক করবে।
এই চার মাসের পাইলট প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৮১ লাখ, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ কোটি ২১ লাখ, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ১ কোটি ৬১ লাখ ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে। চার বছরে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ কোটি পরিবারের মধ্যে ধাপে ধাপে সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে।
লেখক: সিনিয়র তথ্য অফিসার (জনসংযোগ কর্মকর্তা) সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা
পিআইডি ফিচার