1. admin@timesnews71.com : অ্যাডমিন :
কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা, বায়ারের লুনা কীটনাশকে লেবেলের সঙ্গে পরীক্ষায় অমিল, অতি উচ্চমূল্যে বিক্রি — দেখার কেউ নেই! | টাইমস নিউজ ৭১
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৪ অপরাহ্ন

কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা, বায়ারের লুনা কীটনাশকে লেবেলের সঙ্গে পরীক্ষায় অমিল, অতি উচ্চমূল্যে বিক্রি — দেখার কেউ নেই!

  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

লেলিন মাহমুদ:-

——-
বাংলাদেশের কৃষি খাতে ব্যবহৃত বিদেশি কীটনাশক নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বহুজাতিক জার্মান কোম্পানি বায়ার ক্রপ সায়েন্সের ‘লুনা’ নামের কীটনাশক (পিঁয়াজে ব্যবহারযোগ্য) পরীক্ষায় ঘোষিত লেবেলের সঙ্গে অমিল পাওয়া গেছে। গায়ে লেখা আছে ফ্লুপাইরাম-২৫% ও ট্রিফ্লক্সিস্ট্রবিন-২৫%, অথচ বাস্তব পরীক্ষায় পাওয়া গেছে মাত্র ২১.৩৭% করে। অথচ সরকারের কাছে তাদের ঘোষণাপত্রে এই পরিমাণই উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ লেবেল ও বাস্তব উপাদানের মধ্যে ইচ্ছাকৃত ফারাক রেখে কোম্পানিটি সরকার ও কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা করছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের ও অতি উচ্চমূল্যের এই ধরনের কীটনাশক কৃষককে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে দেশের খাদ্যশস্য, মাটি ও মৎস্য সম্পদও হুমকির মুখে পড়ছে।

উচ্চমূল্যের অযৌক্তিক ধারা::

লুনা কীটনাশকের ১০০ গ্রাম বোতলের দাম বাংলাদেশে ১,৩১০ টাকা, অথচ গুগলে সার্চ দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য দেখা যায় প্রায় ১,১০০ টাকা। পাশের দেশ ভারতেও একই পরিমাণ পণ্যের দাম মাত্র ৫৭০ রুপি (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭০০ টাকা)।

ভারতে সরকার কৃষি-রসায়নের দাম নিয়ন্ত্রণ করলেও বাংলাদেশে ব্যবসায়ীরাই দাম নির্ধারণ করছে। ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে অতি উচ্চমূল্যে এসব পণ্য কিনছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কীটনাশকের মতো কৃষিজ ইনপুটের দাম যদি সম্পূর্ণভাবে বহুজাতিক কোম্পানির ইচ্ছাধীন থাকে, তবে কৃষক কখনোই লাভবান হতে পারবেন না। পণ্যের প্রকৃত আমদানি মূল্য, শুল্ক আর বাজারদরের মধ্যে বিশাল ব্যবধান থেকে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার হচ্ছে।

হাওরে মৎস্য ও কৃষির ক্ষতি::

সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা পরিষদে এক আলোচনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, ‘হাওর অঞ্চল দেশের বোরোধানের অর্ধেক উৎপাদন করে। কিন্তু অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের পথে। কৃষকরা তাৎক্ষণিক ফসল বাঁচাতে কীটনাশক ব্যবহার করছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ফসল, মাছ, মাটি—সবই দূষিত হচ্ছে।”

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বার্ক) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে ৮১.৫%। ৫০ বছরে ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪০ হাজার টন। এতে লেড, ক্যাডসিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো হেভি মেটাল ফসল ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের কোথাও এ ধরনের কীটনাশক আমদানি ও ব্যবহারের অনুমতি নেই।

শুল্কনীতি বৈষম্য: ক্ষতিগ্রস্ত দেশীয় শিল্প::

দেশের শিল্পোদ্যোগীরা বলছেন, দেশীয়ভাবে কীটনাশক উৎপাদনের কাঁচামালে ৩৫–৫৮% শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। অথচ বিদেশি কোম্পানির আমদানিকৃত নিম্নমানের কীটনাশকে শুল্ক মাত্র ৫%। এতে স্থানীয় শিল্প টিকতে পারছে না, আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সহজেই বাংলাদেশি কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য আদায় করে মুনাফা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে।
এফবিসিসিআই একাধিকবার সরকারের কাছে এই বৈষম্যমূলক শুল্কনীতি পরিবর্তনের অনুরোধ করেছে। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

কৃষকই চূড়ান্ত ভুক্তভোগী::

বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়। কৃষকেরা পোকামাকড় দমনে লুনার মতো পণ্যের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু অতি উচ্চমূল্য কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাজারে পেঁয়াজের দাম কম হলে তারা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে কোম্পানির দেয়া দামেই কীটনাশক কিনি। সরকারের কেউই এ দিকটা খোঁজ নেয় না। লাভ তো দূরের কথা, অনেক সময় চাষ খরচই ওঠে না।”

সরকারের ভূমিকা কোথায়::

লুনার মতো কীটনাশকের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সুস্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি। কৃষি মন্ত্রণালয়, খামারবাড়ির পেস্টিসাইড শাখা ও ট্যারিফ কমিশন—সব পক্ষই দায় এড়িয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—আসলে কে নির্ধারণ করছে কীটনাশকের মূল্য?
কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কীটনাশকের আমদানি, মূল্য নির্ধারণ ও বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর নীতি গ্রহণ করা জরুরি। তা না হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দেশীয় শিল্প ধ্বংস হবে, আর বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে বিলিয়ন ডলার মুনাফা নিয়ে যাবে।

তাদের মতে,বায়ারের ‘লুনা’ কীটনাশক নিয়ে যে বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে, তা শুধু একটি কোম্পানি বা একটি পণ্য নয়—বরং দেশের কৃষি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের অক্ষমতার প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষক, ভোক্তা ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে অবিলম্বে কীটনাশকের দাম ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন। নইলে বিদেশি কোম্পানির হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে বাংলাদেশের কৃষি।

এ বিষয়ে কৃষি উপদেষ্টার কাছে সাংবাদিক লেলিন মাহমুদ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভেজাল কীটনাশক ও কীটনাশকের অপব্যবহার, অযোক্তিক মূল্যবৃদ্ধি বন্ধে সরকার নতুন নীতিমালা প্রণয়ন শুরু করেছে। নিতিমালা শেষ হলে কৃষি কাজে ব্যবহৃত কীটনাশককের ভেজালমুক্ত, অপব্যবহার ও উচ্চমূল্য রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ টাইমস নিউজ ৭১
Theme Customized By Times News 71