
টাইমস নিউজ ডেস্ক:-
বাবাকে হারানোর শোক কাটার আগেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বাগেরহাটের শিক্ষার্থী ইকন দাড়িয়াকে। বাবার দাফনের মাত্র ১০ ঘণ্টা পর রাতভর এটিএম বুথে পাহারার দায়িত্ব পালন করে বুধবার (২২ জুলাই) সকালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি। মাত্র ২১ বছর বয়সেই ইকনের একার কাঁধে তার নিজের সহ পরিবারের দায়িত্ব।
ইকন সদ্য প্রয়াত ইসরাফিল দাড়িয়ার (৪৫) ছোট ছেলে। ইকন দাড়িয়া চলতি বছরের এইচএসসির পরীক্ষার্থী। তিনি বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের খরচ চালাতে শহরের রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি টাকা উত্তোলন বুথে রাতের শিফটে নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে কাজ করেন।
বিকেলে বাবার দাফন শেষ করেই মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাতে তিনি আবার নিজ কর্মস্থলে ফিরে যান। এরপর পরদিন বুধবার ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েছেন। একদিকে বাবাকে হারানোর শোক অপরদিকে পরিবারের আহারের দায়িত্ব, চাকরি ও পড়াশোনা সব সামলাতে হচ্ছে তাকে একা হাতে।
পরিবারের স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন ইকন দাড়িয়ার বাবা। সকাল ৬টায় তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে থাকা দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বাদ জোহর জানাজা শেষে মরদেহ গোপালগঞ্জে ইসরাফিল দাড়িয়ার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তার মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
ইসরাফিল দাড়িয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন। বড় ছেলে ইমনও একসময় বাবার সঙ্গে কাজ করতেন। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা আহত হওয়ার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকে পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠেন ছোট ছেলে ইকন।
বাগেরহাট শহরের রেল রোড এলাকার কৃষি ব্যাংকের নিয়মিত গ্রাহক শেখ মিরানুজ্জামান বলেন, আমি প্রায় সময় রাতে টাকা উত্তোলন করতে এখানে আসি। রাতে যতবার এসেছি ছেলেটিকে দেখেছি একটি বই হাতে বসে পড়ছে। কেউ টাকা উত্তোলন করতে আসলে তাকে দরজাটি খুলে দেয় এবং দাঁড়িয়ে সম্মানও দেখায়।
স্থানীয় সোহান শেখ বলেন, আমি রাতে প্রায় সময় ছেলেটিকে দেখি। কোনো গ্রাহক প্রয়োজন হলে তাকে তার কার্যক্রমেও সহযোগিতা করে। গ্রাহক চলে গেলে সে আবার বই নিয়ে পড়তে বসে। কৌতুহলে জিজ্ঞাসা করতে ইকন বলল, আমার পরিবারে উপার্জন করার মতো আমি ছাড়া কেউ নেই। আমার বড় ভাই মানসিক ভারসাম্যহীন, বাবা মারা গিয়েছে কয়েক ঘণ্টা আগে।
ইকন বলেন, আমার বাবা গতকাল হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে। তাকে গোপালগঞ্জে আমাদের পুরানো বাড়িতে কবর দেওয়া হয়েছে। আমার পরিবারে তিনজন সদস্য আমি আমার ভাই ও মা। আমার বড় ভাই মানসিক ভারসাম্যহীন। এখন পরিবারের সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে। আমি একটি এটিএম বুথে চাকরি করি, বেতন ৮ হাজার টাকা।
খানজাহান আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ হাসিব উদ্দিন রাখি বলেন, ইকন আমার কলেজের একজন ছাত্র। বাগেরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৪ দশমিক ১১ পেয়ে আমাদের এই কলেজে ভর্তি হয়। প্রতিটি পরীক্ষাতেই সে অনেক ভালো ফলাফল করেছে। আমি জানতে পেরেছি ও একটি এটিএম বুথে রাতে ডিউটি করে। সে অত্যন্ত মেধাবী একজন ছাত্র। ওর বাবা গতকাল মারা গিয়েছে তারপরও ও পরীক্ষা দিতে গিয়েছে। আমরা তাকে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করব।